চোগলখুরি কাকে বলে ও এর পরিণাম কী?


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উম্মতকে চোগলখুরি করে বেড়ানো থেকে সাবধান করেছেন। কিন্তু এ চোগলখুরি কী? এ সম্পর্কে হাদিসের দিকনির্দেশনা ও করণীয় কী?

চোগলখুরি কী?

পরস্পর ঝগড়া-বিবাদ ও অশান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এক জনের কথা অন্য জনের কাছে লাগানেই চোগলখুরি। তবে হাদিসে পাকে সংক্ষেপে চোগলখুরির পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। তাহলো-

হজরত ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘ওহে! আমি কি তোমাদের জানাবো চোগলখুরি কী? চোগলখুরি হচ্ছে: ‘মানুষের মাঝে কথা চালাচালি।’ (মুসলিম)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই হাদিসটি জিজ্ঞাসা ও প্রশ্ন দিয়ে শুরু করেছেন। যাতে মানুষ মনোযোগের সঙ্গে বিষয়টি গ্রহণ করে এবং চোগলখুরি করা থেকে বিরত থাকতে সতর্কতা অবলম্বন করে। এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

হাদিসে পাকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন ‘চোগলখুরি কী? এরপর তিনি নিজেই এ প্রশ্নের উত্তরে বলেন,

চোগলখুরি হলো: মানুষের মাঝে দ্বন্দ্ব-বিভেদ ছড়াতে কারো ব্যাপারে কুৎসা রটানো। কেননা এ ধরণের কাজ করেই জমিনে ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি ও মানুষের ক্ষতি করা হয়। ভালোবাসার সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটানো হয়। নিকটাত্মীয়দের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করানো হয় এবং হিংসা-বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়। যা বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান।

চোগলখুরি করার কারণ কী?

ব্যক্তিভেদে চোগলখুরির বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তবে অধিকাংশ সময় মানুষের এসব কথা চালাচালির কারণ হলো- অন্যের কাছে নিজেকে আপন করে তুলতে বা নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে বা দুনিয়াবী সুযোগ-সুবিধা লাভে কিংবা ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করতে একজনের কথা অন্যজনের কাছে বলে দেওয়া।

আর এসব কথা চালাচারির মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে, ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে ফেতনা-ফাসাদ এবং অশান্তি সৃষ্টি করা। ইসলাম এটিকে চোগলখুরি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

চোগলখুরির বিধান ও পরিণাম

ইসলামে চোগলখুরি হারাম ও মারাত্মক অপরাধ। এটি হক্কুল ইবাদ নষ্টের শামিল। যে ব্যক্তি চোগলখুরি করবে; তাকে অবশ্যই ওই ব্যক্তির কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে; যার ব্যাপারে সে চোগলখুরি বা কথা চালাচালি করেছে। চোগলখুরির পরিণাম খুবই ভয়াবহ। হাদিসে পাকে এসেছে:

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেছেন, ‘চোগলখোর ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (বুখারি, মুসলিম ও মিশকাত)

হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন মদিনার একটি খেজুর বাগান দিয়ে যাচ্ছিলেন, সেখানে তিনি দুই ব্যক্তির আহাজারি শুনতে পেলেন। তখন তাদেরকে কবরে শাস্তি দেয়া হচ্ছিল। প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘এ (ব্যক্তি) দু’জনকে বড় কোনো কারণে আযাব দেয়া হচ্ছে না; অবশ্য এগুলো কবিরা গোনাহ। তাদের একজন পেশাব থেকে পবিত্রতা অর্জন করত না; আর অন্যজন চোগলখুরি করে বেড়াতো।’ (বুখারি, মুসলিম ও মিশকাত)

বর্তমান সময়ে চোগরখুরির ভয়াবহ অভিশাপে পারিবারিক জীবনে স্বামী-স্ত্রীতে অশান্তি ও কলহ বিরাজ করছে। কর্মস্থলে কিংবা অফিসে কর্মী-দায়িত্বশীলদের মাঝে বিরূপ মনোভাবও তৈরি হচ্ছে এ চোগলখুরির কারণে।

চোগলখুরি কি নিন্দনীয় কাজ?

হ্যাঁ, চোগলখুরি মারাত্মক খুবই নিন্দীয় কাজ। তাই কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা চোগলখুরির বিষয়টি তুলে ধরে তা থেকে বিরত থাকার মানুষকে এভাবে নসিহত করেন: ‘আর অনুসরণ কর না তার; যে কথায় কথায় শপথ করে; যে লাঞ্ছিত। পেছনে নিন্দাকারী; যে একের কথা অপরের কাছে লাগিয়ে বেড়ায়।’ (সুরা ক্বালাম : আয়াত ১০-১১)

হাদিসের বর্ণনায়ও এরা নিকৃষ্ট। পরকালে সবচেয়ে খারাপ লোকদের সঙ্গে তারা ওঠবে। হাদিসে এসেছে: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন সবচেয়ে খারাপ লোকদের দলভুক্ত হিসেবে ঐ ব্যক্তিকে দেখতে পাবে- যে ছিল দু’মুখো; যে একজনের কাছে এক কথা আরেকজনের কাছে ভিন্ন কথা নিয়ে হাজির হতো।’ (মুসলিম)

সুতরাং মুমিন মুসলমানের উচিত, চোগলখুরি করা থেকে বিরত থাকা। চোগলখুরির মতো হারাম এবং কবিরাহ গুনাহ থেকে বিরত থাকা। চোগলখুরির অপরাধে জড়িয়ে জান্নাত থেকে বঞ্চিত না হওয়া।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে চোগলখুরির মতো ভয়াবহ খারাপ অভ্যাস থেকে সবাইকে হেফাজত করুন। চোগলখুরিমুক্ত জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। কোরআন-সুন্নাহর ওপর যথাযথ আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।